fbpx

 ৬-দফা আন্দোলনকে কেন বাঙালির ‘ম্যাগনাকার্টা’ বলা হয়?

 প্রশ্নঃ ৬-দফা আন্দোলনকে কেন বাঙালির ‘ম্যাগনাকার্টা’ বলা হয়?

ভূমিকাঃ অত্যাচারী শাসকের ক্ষমতা খর্ব করার দলিলের নাম হলো মাগনা কার্টা। এই নামের উৎপত্তি হয়েছে ১২১৫ সালের ১৫ ই জুন। ইংল্যান্ডের তৎকালীন রাজা জন তার প্রজাদের সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল করতেছিলো, তখন সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে রানিমেড নামক জায়গায় একটি চুক্তি সাক্ষর করে যার নাম এই ম্যাগনাকার্টা। ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি, পাকিস্তানের লাহোরে বিরোধী দলের এক সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর হাত থেকে নিরীহ বাঙালিকে শোষণ মুক্ত রাখতে ৬ টি ভিন্ন ভন্ন দাবি পেশ করেন। ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক মাগনাকার্টার সাথে ভাবগত মিল থাকায় ৬ দফা দাবি সমূহকে বাঙালির ম্যাগনাকার্টা বলা হয়। এখন আমরা ৬ দফার দাবি গুলো পর্যালোচনা করে এটিকে ম্যাগনাকার্টা বলার যথার্থতা বিশ্লেষণ করবো।

১. রাজনৈতিক মুক্তি: ঐতিহাসিক ৬ দফার প্রবক্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই দফাগুলোর প্রথমেই তিনি বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তির কথা ব্যাক্ত করেছেন।তিনি বলেন পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রীয় পদ্ধতির সরকার গঠন করতে হবে। এখানে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

আরো পড়ুনঃ ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কারণ ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর

২. প্রাদেশিক স্বাধীনতা: এই দাবি মতে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মাত্র দুটি বিষয় থাকবে, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যান্য সকল বিষয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে। অঙ্গরাজ্যগুলোকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য আধা সামরিক বাহিনী গঠন করার ক্ষমতা দিতে হবে।

ইউটিউবে ভিডিও লেকচার দেখুনঃ


৩. অর্থনৈতিক মুক্তি: পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্থানে  হয় অবাধে বিনিয়োগযোগ্য দু’ধরনের মুদ্রা থাকবে, না হয় বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে একই ধরনের মুদ্রা প্রচলন করা হবে। অঙ্গরাজ্যগুলো নিজেদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার মালিক হবে, এবং এর নির্ধারিত অংশ তারা কেন্দ্রকে দেবে।

৪. কর আরোপের ক্ষমতা: এই দাবির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো কর আরোপের ক্ষমতাটি নিশ্চিত করা. এখানে বলা হয় সকল প্রকার কর ধার্য করার ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। এবং আঞ্চলিক সরকারের আদায়কৃত রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট অংশ কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।

৫. জাতীয়তাবাদের শক্তভিত্তি গঠন: যখন একটি জাতির মানুষেরা তাদের মঙ্গলকর কোন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য একত্রিত হয়ে পথচলা শুরু করে তখন তাকে জাতীয়তাবাদ বলে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের শুভ সূচনা হয়েছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সফল বিজয়ের মাধ্যমে। পরবর্তীতে ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় সেই জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে দৃশ্যমান রূপ দেয় এবং ৬২ শিক্ষা আন্দোলন পেরিয়ে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষিত দাবিগুলো বাঙালির জাতীয়তাবাদকে আরো ত্বরান্বিত করে পাকিস্তানি অত্যাচারী বাহিনীর শোষণ থেকে মুক্তির আন্দোলনে তাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়. তাই বলা যায় ১৯৬৬ সালের ৬ দফা বাঙালি জাতীয়তাবাদের  ভিত্তিকে শক্ত করেছে।

৬. স্বাধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত: স্বাধিকার আন্দোলন হল নিজেদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন হলো পশ্চিম পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনীর যাঁতাকল থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফার দাবিগুলোতে যে বক্তব্য তুলে ধরেছেন তাতে তিনি পূর্ব পাকিস্তান তথা বাঙালির জাতীয় জীবনে সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। যেন অর্থ রাজনীতি সংস্কৃতি বা সমরনীতি কোন কিছুতেই পশ্চিমাদের উপর বাঙ্গালীদের নির্ভর করতে না হয় তা তিনি এই দাবিগুলোর মাধ্যমে নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। 

আরো পড়ুনঃ যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বর্ণনা কর

৭. আইয়ুব খানের পতন থেকে ৭০ এর নির্বাচনে জয়লাভ পর্যন্ত ঘটনাগুলোর চালিকাশক্তি: ৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমান যে দাবিগুলো তুলে ধরেছিলেন পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীরা সেগুলোকে দেশদ্রোহিতার শামিল বলে উল্লেখ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান একজন অপরাধী। কেননা, তিনি পশ্চিম পাকিস্তান হতে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছেদ করা ষড়যন্ত্র করছে।  তাদের এরকম বিমাতা সুলভ আচরণে বাঙালি জাতি ক্ষুব্ধ হতে থাকে। ফলশ্রুতিতে ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান ঘটে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে লৌহ মানব খ্যাত আইয়ুব খানের শাসনামলের পতন ঘটে। 

google news

৮. গণঅভ্যুত্থানের ১১ দফা: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানি মূলত বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ প্রশস্ত করে দেয়। কেননা, এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসে পরবর্তীতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে. এই আন্দোলনে ১১ দফা দাবি উত্থাপন করা হয় যেই দাবিগুলো মূলত ছয় দফা দাবির প্রসারিত অংশ. এখানে বাঙালির তৎপরবর্তী কর্মপ্রক্রিয়া ঘোষণা করা হয়.

৯. বাঙালি জাতিকে ঐক্য গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করে: উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা এটুকু বুঝতে পেরেছি যে ৬৬ সালের পরে বাঙালির ইতিহাসে যতগুলো আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে উঠেছে সবগুলোর ভিত্তি ওই ছয় দফার দাবি। তারই রেফারেন্সে আমরা বলতে পারি ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিযুদ্ধের জন্য যে আহ্বান জানান তা মূলত ওই ছয় দফার সারমর্ম। 

আরো পড়ুনঃ ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল ও গুরুত্ব বর্ণনা কর

১০. স্বাধীনতা আন্দোলন ও চূড়ান্ত বিজয়: ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালি জাতি পাকিস্তানি সামরিক সরকারের নিকট হতে তাদের বহুল কাঙ্খিত বিজয় ছিনিয়ে নেয়। মূলত যে সকল আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে ১৯৭১ সালে ২৬ শে মার্চ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তার অধিকাংশই গতি সঞ্চার করেছিল ৬৬ ছয় দফার দাবিগুলো থেকে। ওই দাবিগুলো থেকেই বাঙ্গালিরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সোচ্চার হয়। তারা নিজেদেরকে বুঝতে শিখে এবং পশ্চিম পাকিস্তানিরা যে তাদেরকে মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই এই কথার আড়ালে মৃত্যুর মুখে পতিত করছে তা বুঝতে পারে। আত্মসচেতন হয়ে তারা মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে.

উপসংহার: উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এখন এই মর্মে উপনীত হতে পারি যে বাঙালির হাজার বছরের কাঙ্খিত বিজয়ের পেছনে ছয় দফা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আইয়ুব খানের দীর্ঘ ১০ বছরের সামরিক শাসনের পতন থেকে শুরু করে 1971 সালে ২৬ শে মার্চ হতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত সকল স্বাধিকার  আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে কাজ করেছে এই ছয় দফার দাবিগুলো। তাই আমরা ইংরেজদের ম্যাগনাকার্টার সাথে মিল রেখে বলতে পারি ছয় দফা আমাদের দাবি আদায়ের একটি দলিল বা এ দেশে পাকিস্তানের মিলিটারি বাহিনীর শক্তি নিঃশ্চিহ্ন করতে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালনকারী লিখিত ডকুমেন্টস।

Shihabur Rahman
Shihabur Rahman
Hey, This is Shihabur Rahaman, B.A (Hons) & M.A in English from National University.

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

ফেসবুক পেইজ

কোর্স টপিক