fbpx

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারণ ও ফলাফল কী ছিল?

প্রশ্নঃ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কী? আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারণ ও ফলাফল কী ছিল?

ভূমিকা: পূর্ব পাকিস্তানে ছয়দফাভিত্তিক আন্দোলন ক্রমশ জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে, এ সময় স্বৈরাচারী সরকার দেশদ্রোহিতার অজুহাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রতিরক্ষা আইনে গ্রেফতার করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন, অতঃপর শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা দায়ের করে কুমিল্লা সেনানিবাসে আটক রাখেন। শাসকগোষ্ঠীর মিথ্যা অভিযোগ ছিল যে, শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অনুচরবর্গসহ ভারতের সাথে যোগাযোগ করে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছিল।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে দায়ের করা একটি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগ নেতা ও পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করেছিল। ১৯৬৮ সালের প্রথম ভাগে দায়ের করা এই মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, শেখ মুজিব ও অন্যান্যরা ভারতের সাথে মিলেপাকিস্তানের অখন্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এই মামলাটির পূর্ণ নাম ছিল রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবর রহমান গং মামলা। তবে এটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসাবেই বেশি পরিচিত, কারণ মামলার অভিযোগে বলা হয়েছিল যে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় কথিত ষড়যন্ত্রটি শুরু হয়েছিল।

আরো পড়ুনঃ ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কারণ ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর

আগরতলা মামলার কারণ: নিচে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কারণ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো :

১. শেখ মুজিবুর রহমানকে দমন: আইয়ুব খান শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তাকে ভয় পেত, তাছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানের ছয়দফা ভিত্তিক আন্দোলন আইয়ুব সরকারকে নড়বড়ে করে দেয়। এতে ভীত হয়ে আইয়ুব খান মামলার আশ্রয় নেয়।

২. ঐতিহাসিক দিক: পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস হলো সংগ্রাম-আন্দোলন আর অত্যাচার ও নির্যাতন। আইয়ুব সরকার তাই পূর্ব বাংলাকে দমন পীড়ন করার জন্য মামলা দায়ের করেছিল।

৩. আন্দোলন ভীতি: পূর্ব বাংলার জনগণ প্রায়ই আইয়ুব সরকার বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিত। এতে আইয়ুব খান অস্বস্তিবোধ করতো। তাই আইয়ুব খান আন্দোলনকে দমনের জন্য ৩৫ জনের নামে মামলা দায়ের করে।

৪. ছয়দফা ভিত্তিক আন্দোলন: ছয়দফার প্রথম দফা পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন। পূর্ব বাংলার জনগণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন করলে আইয়ুব খান তা দমানোর জন্য আগরতলা মামলা দায়ের করেছিলেন।

৫. সুশীল সমাজের উত্থান: আইয়ুব শাসন আমলে সুশীল সমাজ মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। এ সময় সরকারি ও বেসরকারি অনেক অবসরকালীন ব্যক্তিত্ব আইয়ুব সরকারকে ভাবিয়ে তোলে। ফলে আইয়ুব সরকার মামলার আশ্রয় নেয়।

৬. ছাত্র আন্দোলন: আইয়ুব শাসনামলে শিক্ষাব্যবস্থায় যে কালাকানুন আঁকা হয়েছিল এর প্রতিবাদে ছাত্র জনতা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা দাবি উত্থাপন করে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আগরতলা মামলা দায়ের করা হয়।

আরো পড়ুনঃ যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ বর্ণনা কর

৭. ক্ষমতার লোভ: আইয়ুব সরকার দীর্ঘকাল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য দমন পীড়ন শুরু করে। এতে কাজ না হলে আইয়ুব সরকার মামলার পথ অবলম্বন করে।

৮. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: শেখ মুজিবুর রহমানের ছয়দফা ভিত্তিক আন্দোলন আইয়ুব সরকারকে অতিষ্ঠ করে তোলে। বার বার আন্দোলনের ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে আইয়ুব সরকার অন্য পন্থা অবলম্বন করে মামলা পন্থা বেছে নেয়।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ফলাফল: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ফলাফল ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয় এবং পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের বিরূপতা আরও বৃদ্ধি পায়। এই মামলার ফলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায় এবং তিনি হয়ে ওঠেন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান নেতা।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ফলাফল নিম্নরূপ: 

১. ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ফলে পূর্ব পাকিস্তানে সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিশাল গণমিছিল ও আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়।

২. শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ফলে শেখ মুজিবুর রহমান একজন জাতীয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। এই মামলার ফলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

৩. বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই মামলার ফলে বাঙালিরা বুঝতে পারে যে, তারা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা শোষিত ও বঞ্চিত।

আরো পড়ুনঃ ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফলাফল ও গুরুত্ব বর্ণনা কর

৪. বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ সুগম: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ সুগম করে। এই মামলার ফলে বাঙালিরা স্বাধীনতার জন্য আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, আগরতলা মামলা পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়। আইয়ুব সরকার দমন পীড়নের শেষ অস্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা দায়ের করে শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। কিন্তু বাঙালি জনগণ জাতীয়তাবাদে উজ্জীবিত হয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেয়। এতে আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে নিঃশর্ত মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

Shihabur Rahman
Shihabur Rahman
Hey, This is Shihabur Rahaman, B.A (Hons) & M.A in English from National University.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

ফেসবুক পেইজ

কোর্স টপিক