প্রশ্নঃ সামাজিক আইন কাকে বলে এবং উহার উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব আলোচনা করো।
ভূমিকা: সামজিক আইন হল সমাজের সুবিধা বঞ্চিত (যারা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে) মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে প্রণীত উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপসমূহ। সামাজিক আইনের কাজ হল সমাজের নানা ধরনের অনাচার, দুর্নীতি ও কুসংস্কার দূর করা এবং সমাজের অবহেলিত জনগণের স্বার্থসংরক্ষণের জন্য আর্থসামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। সামাজিক আইনের কল্যাণেই ব্যক্তিগত ও দলগত পর্যায়ে মঙ্গলজনক জীবন লাভ করা সম্ভব হয়েছে।
সামাজিক আইন: সাধারণ অর্থে, সামাজিক আইন হল সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে প্রণীত উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এর সাহায্যে সমাজস্থ বিভিন্ন অনাচার, দুর্নীতি ও কুসংস্কার দূর করা হয়। ব্যাপক অর্থে, কুসংস্কার ও কুপ্রথা এবং সামাজিক সমতা আনয়নের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান প্রণীত বিধিবিধান হল সামাজিক আইন। রাষ্ট্রীয়ভাবে বা সরকারের নিজস্ব ইচ্ছায় সরাসরি সমাজের উন্নয়ন এবং কল্যাণকর পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে যেসব আইন প্রণয়ন করা হয়, তাকেই সামাজিক আইন বলে। যেমন- সতীদাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ, বিধবাবিবাহ, যৌতুক নিরোধ আইন সামাজিক আইন হিসেবে পরিচিত ।
আরো পড়ুনঃ কিশোর অপরাধ কি? কিশোর অপরাধের কারণ গুলো আলোচনা কর।
সামাজিক আইনের প্রামাণ্য সংজ্ঞা: বিভিন্ন মনীষী বিভিন্নভাবে সামাজিক আইনের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। নিম্নে তাঁদের কয়েকটি সংজ্ঞা উল্লেখ করা হল।
অধ্যাপক হল্যান্ডের মতে, “আইন হল মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণের এমন কতকগুলো সাধারণ নিয়ম, যা সার্বভৌম শক্তি কর্তৃক প্রযুক্ত হয়।”
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উইলসন এর মতে, “আইন হল মানুষের প্রতিষ্ঠিত চিন্তাধারা ও আচার অভ্যাসের সে অংশ, যা সাধারণ নিয়মের আকারে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং যার পিছনে সরকারের কর্তৃত্ব ও সমর্থন থাকে।”
স্যার হেনরী মেইন বলেছেন, “কেবল সার্বভৌম শক্তির অনুশাসনই আইন নয়, দেশের প্রচলিত আচার প্রথাও আইন বলে স্বীকৃত, যদিও এগুলো কোন সার্বভৌম আদেশে সৃষ্ট নয়।”
আরো পড়ুনঃ বেকারত্ব কি? বাংলাদেশের বেকারত্ব দূরীকরণের উপায় সমূহ বর্ণনা কর।
সামাজিক আইনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব: সামাজস্থ মানুষের বাহ্যিক আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ, অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের মাধ্যমে বাঞ্চিত আর্থ-সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক অগ্রগতি ও কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্য সামাজিক আইন লক্ষ্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে সামাজিক আইনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব আলোচনা করা হলো-
১) সামাজিক নিয়ন্ত্রণ: সামাজিক আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য মানুষের বাহ্যিক আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ প্রসঙ্গে মহান দার্শনিক এরিষ্টটলের বলেছেন “মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী কিন্তু যখন আইন এবং ন্যায়বিচার থেকে বিছিন্ন থাকে তখন সবচেয়ে খারাপ।”
২) অবাঞ্ছিত অবস্থা দূরকরা: সমাজে বিদ্যমান ও উদ্ভূত ক্ষতিকর, অবাঞ্চিত ও অনাকাঙ্কিত অবস্থা রোধ করতে সামাজিক আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাজের প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনই এর অন্যতম উদ্দেশ্য যেমন- সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ।
৩) পরিকল্পিত পরিবর্তন: সমাজের অগ্রগতি সাধনের জন্য এবং অন্তরায় সৃষ্টিকারী উপাদানসূহ প্রতিরোধ কল্পে সামাজিক আইনের মাধমে পরিকল্পিত সামাজিক পরিবর্তন সাধন করা হয়।
৪) সামাজিক নীতির বাস্তবায়ন: সামাজিক নীতি বাস্তবায়নের সহায়তা প্রদান সামাজিক আইনের অন্যতম লক্ষ্য। বিভিন্ন প্রথা, কুসংস্কার, অজ্ঞতা, প্রতিবন্ধকতা, বিশৃংখলা ইত্যাদি। প্রতিরোধ করে সামাজিক আইন সামাজিক নীতি বাস্ত বায়নে অনুকূল পরিবশে সৃষ্টি করে।
৫) স্বার্থ সংরক্ষণ: জনগণের বিশেষিত অবহেলিত শ্রেণীর অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণ করা সামাজিক আইনের অন্যতম উদ্দেশ। ও গুরুত্ব বহন করে। যেমন-১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন এর মাধ্যমে এ দেশের অবহেলিত নারীগোষ্ঠির সার্থ সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
৬) সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: সামাজিক আইন সমাজ থেকে সর্ব প্রকার সামাজিক বৈষম্য দূর করে: সাম্য ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাছাড়া এর মাধ্যমে প্রাপ্ত সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার সুষম বন্টন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
৭) দ্বন্ধ নিরসন: আদর্শ ও মূল্যবোধজনিত দ্বন্ধ নিরসন করে সামাজিক আইন বিশৃংখলা ও নৈরাজ্য প্রতিরোধ করে। শুধু তাই নয়, সামাজিক আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজে আদর্শ ও মূল্যবোধ সংরক্ষণ করা।
আরো পড়ুনঃ দল সমাজকর্ম কি? দল সমাজকর্মের উপাদানগুলো কী কী?
৮) সমস্যার প্রতিকার, প্রতিরোধ ও উন্নয়ন: বর্তমানে পরিস্থিতি বা সমস্যার সমাধান বা প্রতিকার এবং ভবিষ্যতে সমস্যা ও বিরূপ পরিস্থিতির প্রতিরোধ ও উন্নয়নে গুরুত্বরোপ করা সামাজিক আইনের অন্যতম লক্ষ্য। যেমন- মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইন-১৯৯০।
৯) সংহতি ও স্থিতিশীলতা অর্জন: সামাজিক আইন সমাজে ঐক্য, শৃংখলা, সংহতি ও স্থিতিশীলতা অর্জনও বজায় রাখতে বদ্ধ পরিকর।
১০) সামাজিক নিরাপত্তা বিধান: সামাজিক আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে- সামজ জীবনে উদ্ভূত দুর্যোগ কালীন দূর্ঘটনা, মৃত্যু ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনিশ্চিয়তা দূর করে সামাজিক নিরাপত্তা বিধান করা। যেমন- ভবিষ্যত তহবিল আইন।
উপসংহার: সমাজের পরিকল্পিত পরিবর্তন এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে সামাজিক আইনের গুরুত্ব অপরিসীম। সামাজিক আইনের সহায়তায় সমাজে শিশু, নারী, যুবক ও প্রবীণদের কল্যাণসহ সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। তাই প্রগতি অর্জন, মানবাধিকার এর জনস্বার্থ সংরক্ষণে সামাজিক আইনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।