fbpx

সমাজকল্যাণ ও সমাজ সংস্কার এবং শ্রমিকদের কল্যাণ সাধনে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের অবদান ব্যাখ্যা কর।

প্রশ্নঃ সমাজকল্যাণ ও সমাজ সংস্কার এবং শ্রমিকদের কল্যাণ সাধনে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের অবদান ব্যাখ্যা কর। 

ভূমিকাঃ ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিশাল ব্যক্তিত্ব শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। রাজনৈতিক, শিক্ষা, নিপীড়িত ও শোষিত জনগণের মুক্তিদাতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে তিনি যে অবদান রেখে গিয়েছেন তা বাংলার তথা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে তাকে অমরত্ব দান করেছে। সময় কোনো কোনো মানুষকে সৃষ্টি করে। আবার কেউ কেউ এক একটি বিশেষ সময়ের জন্য জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সাহসী সৈনিকের মতো জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে বুঝাতে পেরেছিলেন এবং তাদের প্রিয় নেতা হিসেবে স্ব-শ্রেণিতে অবস্থান করেই স্বীয় ভূমিকা এবং কর্তব্য নির্ধারণ ও পালনে সক্ষম হয়েছিলেন।

শেরে বাংলার কর্মধারাঃ সুদীর্ঘ ঘটনাবহুল জীবনে শেরে বাংল ফজলুল হক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর কর্মকালের মাধ্যমে আদর্শের যে পরিচয় ফুটে ওঠে তার মধ্যে সময়ের ধারাবাহিকতায় তাকে প্রধানত চারটি খাতে প্রবহমান দেখতে পাওয়া যায়।

  • তিনি মুসলমানদের শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে এদেশে একটি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি গঠনের চেষ্টা চালান।
  • তিনি জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বাঙাদি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটানোর চেষ্টা করেন।
  • তিনি মহাজনী তথা জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের সপক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলেন।
  • তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক অর্থাৎ সাম্প্রদায়িকতার বিরোধী। 

রাজনীতিতে অবদানঃ নির্দিষ্ট আদর্শ ও লক্ষ্যকে সমানে রেখে ফজলুল হক রাজনৈতিক জীবন শুরু করে। মানব স্বাধীনরা ও নিয়মতান্ত্রিক শাসনের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা ছিল। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন বিদ্যমান শ্রেণিভিত্তিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ব্যতীত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা সার্থক হতে পারে না। তিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলিম সম্প্রদায়কে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ রেখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তিনি ছিলেন গণতন্ত্রের প্রবক্তা। 

আরো পড়ুনঃ কিশোর অপরাধ কি? কিশোর অপরাধের কারণ গুলো আলোচনা কর।

ফজলুল হকের মতে, গণতন্ত্র হলো In a democracy the government of the people by the people must be the government of all the people by all the people, not the people,” অর্থাৎ গণতন্ত্রে, জনগণ দ্বারা গঠিত জনগণের সরকার হতে হবে সকল মানুষের দ্বারা গঠিত সরকার। জনগণের একাংশের সরকার জনগণের সরকার হয় না।” 

তাছাড়া এদেশের কৃষকদের মুক্তি ও তাদের রাজনীতি সচেতন করার জন্য ১৯২২-৩৮ সাল পর্যন্ত কৃষক প্রজা আন্দোলন সৃষ্টি ও পরিচালনা করেছিলেন। ১৯২৮ ও ২৯ সালে মুসলিম লীগ সফল করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনেকখানি। তিনি ১৯৩৪ সালে লক্ষীনিরঞ্জন সরকারকে পরাজিত করে কলিকাতার মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৩৫ সালে লক্ষ্ণৌতে অনলবর্ষী উর্দু ভাষায় বক্তৃতার জন্যে তাকে “শেরে বাংলা উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৩৭ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি মন্ত্রিসভা গঠন করেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪০ সালে তিনি লাহোর প্রস্তাব পেশ করেন। ১৯৫৫ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে তিনি এদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। 

শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানঃ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে গেছেন। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকবার মন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় প্রতিবারই তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নিজ দায়িত্বে রেখেছিলেন। ১৯০৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত “মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের” অন্যতম সংগঠক ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। ১৯১২ সালের বঙ্গীয় আইন পরিষদে উত্থাপিত “শিক্ষা পরিকল্পনা বিল” এদেশে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

১৯১২ সালে তিনি মুসলিমছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বাংলার গভর্ণরের সাহায্যের জন্য “সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান এডুকেশনাল এসোসিয়েশন” গড়ে তোলেন। কলকাতায় ‘কারমাইকেল ও ট্রেলর হোস্টেল” নির্মাণে ফজলুল হকের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি নেতৃস্থানীয় উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করেন। 

আরো পড়ুনঃ কল্যাণ রাষ্ট্র কি? কল্যাণ রাষ্ট্রের কার্যাবলী আলোচনা কর।

১৯২৪ সালে ফজলুল হক শিক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজ এবং মুসলমান ছাত্র-ছাত্রীদের আর্থিক সাহায্য দানের জন্য মুসলিম এডুকেশনাল ফান্ড” গঠন করেন। ১৯৩৭ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকার প্রাক্কালে মুসলমান মেয়েদের জন্য “লেডী ব্রাবোর্ণ কলেজ” স্থাপন করেন। তাঁর আমলেই স্কুল ও মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড গঠনের বিল আনীত হয়। সুতরাং বলা যায়, শিক্ষাক্ষেত্রে এ কে ফজলুল হকের অবদান খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষক শ্রমিকদের কল্যাণে ফজলুল হকের অবদানঃ ব্রিটিশ শাসনামলে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কৃষকদের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। এ জন্য তাকে কৃষক প্রজাকুলের মুক্তির দূতও বলা হয়। কৃষক-শ্রমিকের কল্যাণে তাঁর অবদানসমূহের বর্ণনা নিম্নে দেয়া হলোঃ 

১. কৃষক আইন পাসঃ ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার কৃষকরা খাজনা দেয়ার জন্য তাদের সম্পত্তি মহাজনদের কাছে বন্ধক দিয়ে টাকা ধার নিত। মহাজনরা ঐ ঋণের ওপর প্রচুর সুদ চাপাত এবং চক্রবৃদ্ধি হারে এ সুদের হার বাড়াতো এবং কৃষকরা এ ঋণ শোধ করতে পারতো না। ফলে মহাজনরা তাদের ভিটেবাড়ি সব গ্রাস করে নিত। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের প্রচেষ্টায় ১৯১৩ সালের ৪ এপ্রিল কৃষক ঋণ আইন পাস হয়। যার ফলে কৃষকরা জমিদার, জোতদার ও মহাজনদের হাত থেকে মুক্তি পায়।

২. প্রজাস্বত্ব আইন পাসঃ বাংলার কৃষক শ্রেণি যখন জমিদার, জোতদার ও মহাজনদের অত্যাচার ও শোষণে দিশেহারা তখন ফজলুল হক ১৯২৮ সালে প্রজাস্বত্ব আইন পাস করেন এবং ১৯৩৭ সালে এ আইন সংশোধনের মাধ্যমে প্রজাদের স্বত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

৩. কৃষক প্রজা আন্দোলনঃ ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলার কৃষকরা জমির মালিকানা থেকে বঞ্চিত ছিল। অশিক্ষিত ও অবহেলিত কৃষকদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ করে ১৯১৫ সালে বাখেরগঞ্জে নিখিল প্রজা সমিতি গঠন করে কৃষক-প্রজার স্বার্থ আদায়ের জন্য এ আন্দোলন সূচনা হয়েছিল।

আরো পড়ুনঃ মাদকাসক্তি কি? এ সমস্যার সমাধানে একজন সমাজকর্মীর ভূমিকা আলোচনা কর।

৪. কৃষক প্রজা পার্টি গঠনঃ তিনি বাংলার কৃষক সমাজকে জমিদার, জোতদার ও মহাজনদের শাসন-শোষণের হাত থেকে রক্ষার জন্য ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯২৭ সালে কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করেন।

৫. ঋণ সালিসি বোর্ডঃ মহাজনদের শোষণ থেকে কৃষকদেরকে রক্ষার জন্য ১৯৩৭ সালে তিনি শবদীয়া কৃমি বোর্ড আইন” পাস করেন যার অধীনে ১৯৩৮ সালে ঋণ সালিসি বোর্ড গঠিত হয়। যাতে প্রায় আট কোটি প্রজা ঋণমুক্ত হয়।

৬. জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাসঃ জমিদারদের অত্যাচারের জন্য শেরেমিদারি উথেকে ফজলুল হক জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তারই প্রচেষ্টায় ব্রিটিশ সরকার “প্লাউড কমিশন” গঠন করে। এ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন পাস হয়।


উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কর্মময় জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এবং পদক্ষেপই মানবসেবাই উৎসর্গীকৃত ছিল। তিনি ছিলেন জনদরদী হৃদয়বান মানুষ। তাঁর রাজনীতি কখনও হিংসাত্মক বা ষড়যন্ত্রমূলক ছিল না। তিনি বাংলার দুঃস্থ মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তাই তো তাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিচারপতি রাধিকা রঞ্জন গুহ বলেন, “ফজলুল হক আমেরিকায় জন্ম নিলে হতেন ওয়াশিংটন। বিলেতে জন্ম নিলে হতেন ডিসরেলী, রাশিয়ায় জন্ম নিলে হতেন লেলিন এবং ফ্রান্সে জন্ম নিলে হতেই রুশো কিংবা নেপোলিয়ন।” এ মহান পুরুষ ১৯২৬ সালে পরলোকগমন করেন।

Shihabur Rahman
Shihabur Rahman
Hey, This is Shihabur Rahaman, B.A (Hons) & M.A in English from National University.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

ফেসবুক পেইজ

কোর্স টপিক